ঢাকা, বাংলাদেশ  |  মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর ২০২১



  বিভাগ : সাহিত্য তারিখ : ০১-০৪-২০১৯  


জিন্দা লাশ--২


  সাফিয়া রুবি



(গত সংখ্যার পর)

দাদীর মনটা আজকে অনেক বেশি ভালো। বাড়ি ভর্তি আত্মীয় স্বজনের সমাগম।ঈদ ঈদ একটা ভাব পুরো বাড়িতে।নাতি নাতনি নিয়ে দাদীর আজ গল্পের আসর জমেছে।এ বাড়ির মধ‍্যমণী দাদীর ঘর আজ খুবই প্রাণবন্ত হয়ে ওঠেছে যা অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ চোখে পরার মতো।
দাদীর ঘরে একটা বিরাট চৌকি যার বয়স ১০০ বছরের কাছাকাছি। এতটাই মজবুত যে আনায়াসে ১০-১২জন খুবই আরাম করে বসতে পারবে। এই চৌকির কাঠের নামটা কেউ ভালো ভাবে না জানলেও এটিকে এখন লোহা কাঠ বলেই সবাই জানে। এত বছরের পুরোনো চৌকি হলেও এতটুকু ঘুনে ধরে নি এখনো। দাদীর ৯ ছেলে মেয়ে এই চৌকিতে গড়াগড়ি করে বড় হয়েছে। বস্তুত দাদীর পেটের সন্তান ৮ জন আর একজন কন্যা সন্তান জবেদা, দাদার প্রথম পক্ষের সন্তান। দাদী জীবদ্দশায় কোনোদিনও কেউ কখনও বুঝতে পারে নি কন্যাটি তার সৎ কন্যা। সতীনের কন্যা হলেও এ কন্যার জন্য দাদীর অন্তরে ছিলো বিশেষ একটি জায়গা । যে জায়গার বদৌলতে আজ দাদীর ৮ সন্তান তাদের এই বড় দিদিকে রেখেছে পরিবারের সর্বোচ্চ সম্মানের আসনে। পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি কাজ বড় দিদির মতামত না নিয়ে আজঅব্দি কেউ করে নি। দাদীর বিয়ে হয় ১২-১৪ বছর বয়সে। সংসারের চালাক চাতুরি তেমন মাথায় ধরে নি। দাদীর প্রথম সন্তান জয়নাল জন্মের আগে আরো ৩ সন্তান মারা যায়। তাই দাদী অনেক মানত করে ৪টা গরু ছদগা দিয়ে জয়নাল কে পেয়েছেন। তাই সে সময় জবেদাই ছিলো দাদীর একমাত্র ভরসা। তাছাড়া এ বাড়িতে বউ হয়ে আসার পর জবেদাই ছিলো দাদীর একমাত্র খেলার সঙ্গী। আর এখন সবার আলাদা আলাদা ঘর আলাদা আলাদা খাট। সময়ের সাথে সাথে সব পরিবর্তন হয়ে যায় প্রতিনিয়ত।
অনেক দিন পর আজ সব নাতি-নাতনি একসাথে দাদীর ঘরে। কেউ আছে গলা ধরে, কেউবা আবার হাতের আঙুল টিপছে। কেউ হয়তো পায়ের কাছে, কেউবা আবার মাথায় বিলি কাটছে। আর দাদী শিশুসুলভ আচরণ করছে থেকে থেকে। এটা অবশ্য নাতি-নাতনির আদর পেয়ে আর কি। এমন পরিবেশ যদি সকল প্রবীণ জাতি পেয়ে থাকত তবে, হয়ত বা সকল বুড়া-বুড়ি আরো কটা দিন বেশি বাঁচত। যদিওবা জন্ম মৃত্যুর হিসাব বিধাতা স্বয়ং নির্ধারণ করেন। তবুও বোকা মানবজাতি এর সকল দায়ভার নিজের উপর বর্তায়। হয়তোবা এটাই বিধাতার ইচ্ছে।
দাদীর এক নাতি রেজা জানতে চাইলো- ও.....দাদী তুমি কোন পর্যন্ত পড়ালেখা করেছিলে গো।
দাদীর উত্তর... কছছিনা‍..আ তয় ।
আমি দস্তখত পারি হুম। তোগের দাদার নাম লিখতে পারি আমি।
হুম দাদী তা তোমাকে দেখলেই বুঝা যায়।
ও দাদী তোমার নামখানা কে রেখেছিলো গো।
দাদী ফোকলা দাতের একখানা হাসি দিয়ে খুব উৎসাহ নিয়ে বলত শুরু করলেন -
তয় শোন ,আমার মাটিতে পরনের পর আমার বাজান একটা বড় জমি খরিদ করছিল । তাই বাজান খুশি হইয়া আমার নাম রাখছিলো জমিলা। দাদী চোখে মুখে খুশির বিদ্যুৎ চমকানোর মতো অবস্থা।
আহা! কেউ আজ আমার নাম রাখার ইতিহাস জানতে চাইছে?
এতোদিন পর এই জীবন সায়াহ্নে এসে কেউ তার নাম জানতে চাইছে এটা কি ভাবা যায়! জীবনটা সত্যি বড় অদ্ভূত! যে নাম নিয়ে সন্তানের আকিকা দেয়া হয়, যে নামের সাথে একটা পরিচয়, যে নামের একটা সময় বয়ে গেছে, সে নাম আজ তার ঔরসে উত্তরাধিকার জানতে চায়।সময়ের স্রোতে নিজের নামখানাও যে ভাসিয়ে নিয়ে যায় । ভাসতে ভাসতে একসময় সেই নামখানা বয়সের ভারে তলিয়ে যায় সময়ের গভীরে। সেই গভীর থেকে কেউ যদি তা খুঁজে আনতে চায় তখন তাকে সিন্দুকে বন্দী হয়ে থাকা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না।
জমিলা বেগম আজ ক্রমশ তার শৈশবের গন্ধে নিজেকে ডুবিয়ে রাখতে আছন্ন প্রায়।
জমিলা বেগমের চোখের সামনে ভেসে উঠছে কত স্মৃতির ধূম্রজাল।
মেঘনার পাড়ে বালু খেলা। বাঙ্গী, তরমুজ, বাদাম এর খোঁজে রোদে পুড়িয়ে অপেক্ষা।
জমিলা বেগম চলে গেলো তার ফেলে আসা ৭০ বছর পেছনে। আর অনায়াসে বিড় বিড় করে বলে যাচ্ছে সেইসব স্বর্নালী দিনের কথা।
একবার আমি আর শেফালী কি করছিলাম শুন, তাহলে বলেই কুটকুট করে হাসতে লাগল জমিলা বেগম।
জমিলা বেগম: আমার বাজানের গাঙপাড়ে একটা বিরাট জমি আছিল। সেইখানে অনেক তরমুজের চাষাবাদ হইতো।একদিন খুব জেদ চাপল.....
আজ যেভাবেই হোক একটা তরমুজ নিয়েই ছাড়ুম আমি আর শেফালী।
শেফালী: ওরে ! বাবা দেখা দেখলে আমার পা ভাইঙ্গা দিবো ! আমি বু পারুম না! তুইও হাঁটা ধর বইন।
জমিলা: দাঁড়া শেফালী, আর এক পা আগগুয়াইলে বাজানরে কমু তুই আমারে গাঙপাড়ে একলা থুইয়া রাফেজার লগে খেলতে গেছত। আর জানস তো রাফেজার লগে খেলার কথা শুনলে বাজান তরে আর আস্ত রাখবো না। রাফেজার বাপের লগে বাজারের এহন কাইজ্জা হইছে মনে নাই তোর? ঐদিন আমগের ছাগলডা রাফেজাগের ভুট্টা খেতে গিছিল হের লাইগা রাফেজার বাপ আমগের ছাগলডা বাইন্ধা রাখছিল।
খুব রাগী আর বশে আনার ছলে বলে ফেললো জমিলা।
শেফালী এবার ভয়ে জড়সড় হয়ে থেমে গেল কিছুক্ষণের জন্যে। আর অসহায় রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো জমিলার দিকে। এবার শেফালী কুপোকাত হয়েও খানিকটা সাহস নিয়ে বলতে লাগল বাড়িতে তো তরমুজের ছড়াছড়ি হেনে খাওনা কিয়ারে। খেতের থন যে খাইতে চাও।
জমিলা: মুখ উঁচিয়ে আমার ইচ্ছা, বাইততো বাজান আড়ৎদারগের লাইগা ভালা ডি গুছাই রাহে, আর যেগুন থায়ে ওডি আমগের দেয়।
আর আজকা আমি আমার স্বাদমতো খেতের থন বাইছ্ছা খামু।
শেফালী এবার বুঝতে পারলো বুবু তার নাছোড়বান্দা। কিছুতেই বু শুনবে না। শেফালী খুব ভালো করে জানে জমিলা ভাঙবে তবু মচকাবে না। তাই আর বেগ সাধলো না।
দুজনে মিলে খেতের সবচেয়ে পরিপক্ক তরমুজখানা নিয়ে নদীর পাড়ে মিলে প্রায় সাবার করবে। এমন সময় পূবদিক থেকে খেতের মালিক জমির সরকারের গলার স্বর। আর অমনি দুবোন মিলে নদীতে পিলপিল করে নেমে গেল।নেমেই পানির তলায় ডুবে রইল।
জমিলা বুঝতে পারছে পানির ঢেউটা ক্রমশ বাড়ছে। তার মানে এদিকে কোনো বড় কিস্তি ভিড়ছে মনে হয়। প্রসঙ্গত চরাঞ্চলের বড় বড় নৌকাকে আগে কিস্তি বলা হতো। নাহ আর পারন যাইতো না মনে হয়। কি করব একথা ভেবে সাহস করে জমিলা তার মাথা ভর্তি দীঘলকালো চুলগুলোকে নাড়া দিয়ে মাথাখানা পানির নিচ থেকে হালকা জাগায়ে চোখ জোড়া মেলে চাইলো। সত্যিই একটা বড় কিস্তি ভিড়ছে এ কিনারে।
মনে হচ্ছে কোন বড় পাটের আড়ৎদার।
জমিলা দেখতে পেলো কিস্তি থেকে এক জোড়া স্বচ্ছ চোখ আটকা পরেছে জমিলার মায়াভরা দুরন্ত দুটি চোখের উপর। যে চোখ দুটো ডুবে মরতে চাইছে জমিলার জলে ভেজা দুই চোখের মনিকোঠায়।
ক্রমশ কিস্তিটি কাছে চলে এসেছে। নদীর ঢেউয়ের প্রসারতা আর গভীরতার সঙ্গে জমিলার দীঘলকালো চুলগুলো যেন সর্পনৃত‍্য করছিল।
তৎক্ষণাৎ জমিলা অনুভব করলো কেউ বুঝি ওর চুলগুলোকে স্পর্শ করে গেলো। যে অনুভূতিতে জমিলার গায়ে খানিকটা মৃদু শিহরণ জাগিয়ে দেয়। কিন্তু জমিলা এর কোনো কিছুই যেন আবিষ্কার করতে পারলো না।
জমিলা চোখ ঘুরিয়ে ফিরতেই বুঝতে পারলো কিস্তিটি ওকে পাশ কাটিয়ে তীরে ভিড়ছে।
কিন্তু এক জোড়া শিহরিত চোখ ভিড়ে আছে জমিলার জেগে থাকা ভেজা দুচোখের দৃষ্টি।


(চলবে)

সাফিয়া রুবি: লেখক                     
emil: safiarubi2010@gmail.com


 নিউজটি পড়া হয়েছে ১৪৬৪ বার  


 এই ধারাবাহিকের সকল পর্ব  

•   জিন্দা লাশ--২






 

সাহিত্য

সময়

ময়না মামুর বাড়ি যাবো

একগুচ্ছ কবিতা

মৃত্যু: রকমারি জিজ্ঞাসার বুদ্বুদ

মানবী

নাইরান নাজমুলের কবিতা

নতুন বাড়ি

সুবির দাসের কবিতা

Live at home

মোনালিসার সাথে ফেসবুক প্রেম ও তারপর!

সাহিত্য বিভাগের আরো খবর





সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি:
আবদুল্লাহ আল হারুন
প্রধান সম্পাদক:
আসিফ হাসান (নূর নবী)

সম্পাদক ও প্রকাশক:
মো. জিয়াউল হক
বিশেষ সংবাদদাতা:
র‌বিউল ইসলাম সো‌হেল

আমাদের মানচিত্র

ঠিকানা: দেওয়ান কমপ্লেক্স (৩য় তলা), ৬০/ই/১, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
কক্ষ নং ১৪/সি, নোয়াখালি টাওয়ার (১৪ তলা), ৫৫-বি, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০

ফোন: ০১৯১৪-৭৩৫৮৫৮, ০১৯১৪-৮৭৫৬৪০
ইমেইল: editor@amadermanchitra.com, amadermanchitrabd@gmail.com

Location Map
Copyright © 2012-2021
All rights reserved

design & developed by
corporate work