ঢাকা, বাংলাদেশ  |  মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর ২০২১



  বিভাগ : ভ্রমণ তারিখ : ০২-০৮-২০২১  


ওল্যান্ডের পথে-১


  লিয়াকত হোসেন



লিয়াকত হোসেন: সুইডেনের ২৫টি প্রদেশের মধ্যে সবচেয়ে ছোট প্রদেশ ওল্যান্ড।
বাল্টিক সাগরের ভেতর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে আচ্ছাদিত প্রাচুর্যে ভরা একটি দ্বীপ। দ্বীপটির আয়তন মাত্র ১৩৪২ কিলোমিটার। ঘণ্টায় একশত কিলোমিটারে গাড়ি ছুটিয়ে মাত্র তের চৌদ্দ ঘণ্টায় পুরো দ্বীপটি ঘুরে আসা যায়। সাগরপাড়ের পথে সাগরের মৃদুমন্দ হাওয়ায় গাড়ি ছোটার আনন্দই আলাদা। বিস্তীর্ণ নির্জন দ্বীপে স্থানীয় অধিবাসীর সংখ্যা মাত্র ছাব্বিশ হাজার। প্রকৃতিকে সাজিয়ে ও ধরে রাখার মানসে দ্বীপে রেলপথ বা বিমান পথ নেই। রেল যোগাযোগ ছিলো বর্তমানে উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। তাই পুরো দ্বীপটি ঘুরে বেড়াতে গাড়ি, সাইকেল ও নৌকার বিকল্প নেই।

হোটেল ফেঙ্গেলসে ও কনফারেন্স

মূল ভূমি কালমার হয়ে দ্বীপে আসতে হলে বাল্টিক সাগরের উপর দিয়ে দীর্ঘ ছয় কিলোমিটার গাড়ি ছুটিয়ে আসতে হয়। নৌকায়ও আসা যায় তবে আকাশ পথে নয়। বাল্টিক সাগরের উপর দীর্ঘ সেতু পাড়ি দিয়ে দ্বীপে আসার পথটুকু কাব্যময়। ইতিহাস বলে খৃষ্টের জন্মের আট হাজার বছর আগে ওল্যান্ড দ্বীপে মানুষের আগমন ঘটে। মানুষ অদম্য, সে সময় সেতু না থাকলেও কালমার হতে বাল্টিক সাগরের উপর বরফের সেতু বানিয়ে মানুষ দ্বীপে এসে উপস্থিত হয়। বরফের সেতুর কথা শুনে অনেকের কপালে ভাঁজ পরতে পারে কিন্তু তা সম্ভব। শীতকালে এদেশের নদী নালার জল জমে বরফ হয়, হ্রদ ও সাগরের জলের উপর পরে পুরু বরফের আস্তর তাই আইস স্কি বা চলাচলে অসুবিধে হয়না। সে যুগের মানুষ এভাবেই সাগর পেরিয়ে দ্বীপে এসেছিলো।

বাল্টিক সাগর থেকে সূর্যাস্ত দেখা। দূরে ওল্যান্ড ব্রিজ

প্রায় একবছর আগে সিদ্ধান্ত নেয়া সুইজারল্যান্ডের ভ্রমণসূচি যখন করোনার কারণে স্থগিত হলো তখন ভাবলাম সুইডেনের ভেতর ওল্যান্ড থেকে ঘুরে আসা যাক। ওল্যান্ডে এর আগেও এসেছি। কালমার বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতার উপর প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নেয়ার জন্য আসতে হয়েছিলো। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ওল্যান্ড ভ্রমণের ব্যবস্থা করেছিলেন।

ভেস্তারভিক
ওল্যান্ড যাবার পথে ভেস্তাভিক। বাল্টিক সাগরের উপর ছোট একটি শহর।
শহরটি দেখার উদ্দেশ্যে এক রাত থাকার পরিকল্পনা হলো। এক রাতের জন্য এক ঐতিহাসিক হোটেল নেয়া হলো, হোটেলের নাম হোটেল ফেঙ্গেলসে ও কনফারেন্স। নাম শুনে অনেকে ভয় পেতে পারেন। ফেঙ্গেলসে অর্থাৎ জেলখানা। আঠারোশ শতকে এটি ছিলো জেলখানা। ভয়ংকর কয়েদিদের এখানে আটক রাখা হতো। বর্তমানে জেলখানা ভেঙ্গে হোটেল হয়েছে। ভেস্তারভিক শহর ও রেলওয়ে স্টেশানের কাছে বলেই হোটেলটি  পর্যটকদের লোভনীয়। হোটেল বানানো হলেও কয়েদিদের ছোট ছোট সেলগুলো সংস্কার করে এক একটি কক্ষ। লবির পরোটাই কয়েদিদের ছবি, শাস্তি দেবার উপকরণ ও ফাঁসির মঞ্চ সাজানো। আমরা যে রুমটি পছন্দ করলাম সেটি ছিলো জেলের লন্ড্রি। রুমটি বড়, আধুনিক তবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত নয়। জেলে অবস্থানের সময় কয়েদিদের দিয়ে ভেস্তারভিক রেলওয়ে ও রাস্তা নির্মাণ সংস্থার পোশাক তৈরি করানো হতো। যারা কাজ করতে চাইতোনা তাদের জেল স্কুলে যেতে হতো। ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত কয়েদিদের জেলসংলগ্ন স্থানে ফাঁসি দেয়া হতো। তবে খোলা জায়গায়। হোটেলের সামনেই প্রশস্ত খোলা প্রান্তর। যদিও খোলা স্থানটি বর্তমানে দেয়াল দিয়ে ঘিরে দেয়া হয়েছে। ঘেরা স্থানে ছোটখাট মঞ্চ একটি আছে আর আছে সুদৃশ্য চেয়ার টেবিল, হোটেল অতিথিদের বৈকালিক বিশ্রাম স্থান।

বাল্টিক সাগর তটের গাছ

হোটেলের অভ্যর্থনা বন্ধ হয় বিকেল পাঁচটায় সে সঙ্গে রেস্টুরেন্টও। তবে পেছনের লোহার ফটক খোলা থাকে সারারাত। আমরা বৈকালিক চা পর্ব ও রাতের ডিনারের উদ্দেশ্যে পেছনের ফটক দিয়ে বেড়িয়ে এলাম। সামনেই স্টেশান। ছোট প্লাটফর্ম। স্টেশানে কোন রেলগাড়ি দেখা গেলোনা। ডিজিটাল বোর্ডে দেখাচ্ছে কখন গাড়ি আসবে কখন ছাড়বে। স্টেশানের লাগোয়া বাসস্টেশান। আমরা স্টেশানকে পেছনে রেখে শহরের দিকে এগিয়ে গেলাম। বড় রাস্তাটি পার হলেই শহরে যাবার পায়ে চলা পথ। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই বাল্টিকের পাড়ে এসে দাঁড়ালাম। লম্বা পাটাতনের পাশে জলের উপর অনেকগুলো নৌকা নোঙ্গর করা। ছোট শহরে অগণিত পর্যটক। কেউবা সাগর তীরে ধীর পায়ে হাঁটছেন, কেউবা বেঞ্চে বসে সাগরের শোভা অবলোকন করছেন। তরুন তরুনীরা পড়ন্ত বিকেলে সাগরে স্নান সেরে নিচ্ছেন। সাগর পারেই দোকানপাট রেস্তোরাঁ। বিকেল আটটার মধ্যেই ডিনার সেরে নিলাম কারণ আটটার পর সব বন্ধ হয়ে যায়। ব্যবস্থাটি ঠিক মনে হলোনা কারণ সূর্য ডুবেই রাত দশটায়। ডোবার পরও র্দীঘ সময় আলোর রেশ থাকে।

উইন্ড মিল
ভেস্তারভিক হতে ওল্যান্ডের দূরত্ব মাত্র দুই ঘণ্টার ড্রাইভ।
ঠিক হলো দুপুর লাঞ্চশেষে রওয়ানা হয়ে বিকেল পাঁচটার মধ্যে ওল্যান্ড নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছাবো। সকালে নাস্তাশেষে বেলা এগারোটার মধ্যে রুম ছেড়ে দিলাম। গাড়িতে লাগেজ উঠিয়ে হোটেল পার্কিং-এ গাড়ি রেখে শেষবারের মত ভেস্তারভিক দেখতে বেড়িয়ে পড়লাম। কাঠফাটা গরম, সাগর থেকে যে বাতাসটা আসছে সেটাই একটু শীতল। কাঠফাটা রোদে রাস্তা ঘাটে লোক চলাচল কম। লাঞ্চের পর বেড়িয়ে পড়লাম ওল্যান্ডের উদ্দেশ্যে।

আমাদের নির্দেশনা ছিলো ওত্তেনবি (ottenby) ডাইভার্সান দিয়ে সাগরের উপর ব্রিজ পার হয়ে ডানদিকে ওত্তেনবি ধরে চলে যাবো। ব্রিজ পার হবার পর জিপিএস বন্ধ করে দিতে হবে নতুবা জিপিএস ভুল পথে যেতে পারে ও বাড়ি খুঁজে পেতে সমস্যা হতে পারে। সোজা রাস্তা, রাস্তার উপর বাড়ি, হারাবার ভয় নেই। কালমার ধরে প্রায় দুঘণ্টা ড্রাইভ করার পর ওত্তেনবি ডাইভার্সান পাওয়া গেলো। ওত্তেনবি দক্ষিণ ওল্যান্ডের শেষ বিন্দু। বি শব্দের অর্থ গ্রাম। পুরাকাল থেকে এই গ্রামটি পাখিদের অভয়ারণ্য। পাখিদের বিশ্রামের জায়গা। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ফিনল্যান্ড ও রাশিয়ার পাখিরা এখানে এসে বিশ্রাম নেয়। সাহিত্যে নোবেলপ্রাপ্ত সেলমা লর্গালফের বিভিন্ন লেখায় ওত্তেনবির বর্ণনা পাওয়া যায়। পাখির দেখা পেতে হলে ওত্তেনবির জুড়ি নেই।

ছয় কিলোমিটার লম্বা দৃষ্টিনন্দন ওল্যান্ড ব্রিজ

ডাইভার্সান পার হয়েই ওল্যান্ড ব্রিজের উপর উঠে এলাম।
নীল সাগরের উপর দীর্ঘ ছয় কিলোমিটার লম্বা দৃষ্টিনন্দন ব্রিজ। ব্রিজের দুপাশে উত্তাল সাগরের নীল ঢেউ। ঢেউয়ের উপর রোদের প্রতিফলন। সারি সারি গাড়ি ব্রিজ পাড়ি দিচ্ছে। ১৯৭২ সালে নির্মিত সমুদ্র হতে ৪২ মিটার উঁচু ব্রিজটি সুইডেনের দীর্ঘতম ব্রিজ। পারাপারে কোন মাশুল দিতে হয়না। কয়েকটি গোলচত্তর পার হয়ে এগিয়ে গেলাম। হাইওয়ের মত প্রশস্ত না হলেও চওড়া শানবাঁধানো রাস্তা। ওত্তেনবি পর্যন্ত আমাদের যেতে হবেনা, পথে পরবে ভিকলেবি, আমাদের গন্তব্য। ব্রিজ পার হয়ে মাত্র আঠারো-বিশ মিনিটের ড্রাইভ। যদি মিনিটের কাঁটা ছাড়িয়ে যায় তাহলে বুঝতে হবে গন্তব্য ছাড়িয়ে এসেছি। ভিকলেবির পর ডানদিকে থাকবে চারটে উইন্ড মিল। তিন এবং চার নম্বর উইন্ড মিলের মাঝে বাসা। এদিকটা পুরোটাই গ্রাম, তবে খুঁজে পেতে অসুবিধে হলোনা। প্রথম দুটি উইন্ড মিল পার হবার পরই দেখতে পেলাম একটি পুরানো বাড়ি, বাড়ির সামনে সবুজ ঘাসের উপর সাফকাতের গাড়ি।

পিয়া সাফকাত আলিয়া আইয়ান চারদিন আগেই চলে এসেছিলো।
সামনেই কাঠের খোলা ফটক। প্রচুর জায়গা নিয়ে বিশাল বাড়ি। সামনে পেছনে অযত্নে বেড়ে উঠা ফলের বাগান। আপেল ও বেরি পাকতে শুরু করেছে। গাছে গাছে পাখির কোলাহল। ল্যাভেন্ডার বাগানে সুবাস ছড়িয়ে নীলফুল ফুটেছে। ভ্রমররা স্বশব্দে উড়ছে। বাড়ির উপরের অংশ কাঠের নিচের অংশ পাথরের দেয়াল। ওল্যান্ডের বিশেষ লম্বা ও পাতলা পাথরগুলো একের পর এক সাজানো। পাথর দিয়ে দেয়াল তৈরিতে কোনো সিমেন্ট বা সে জাতীয় কোনো দ্রব্য ব্যবহার করা হয়েছে কিনা বোঝা গেলোনা। কোন কোন পাথরের ফাঁকে পরগাছা পাখা মেলেছে। ফটক হতে দরজা পর্যন্ত পাথরের পথ। ড্রইং কিচেন নিয়ে বিশাল আধুনিক দোতলা বাড়ি। উপরে লবিসহ দুটি বড় শোবার ঘর, নিচে আরো একটি। প্রতিটি ঘর মূল্যবান উপকরণে সাজানো। বিভিন্ন দেশের ভ্রমণবিষয়ক বই ও লিফলেটে পূর্ণ বুক সেল্ফ। আমাদের ছয় জনের জন্য বাড়িটি বিশাল মনে হল।

ওল্যান্ডে সূর্যস্নান

পিয়া আগেই ঠিক করেছিলো আমরা সবাই ডিনার সারবো ফিয়ারস্টদেনে ((Färjestaden).  
আদিকালের ছোট বন্দর ফিয়ারস্টদেন। উনিশ শতকের মাঝামাঝিতেও ছয়শর বেশি বসবাসকারী ছিলোনা। উনিশশ বাহাত্তুরে ওল্যান্ড ব্রিজ তৈরির পর ফিয়ারস্টদেনের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। বর্তমানে জনবসতি ছয় হাজার ছাড়িয়ে গেছে এবং ওল্যান্ডের বৃহৎ জনবসতি ও গুরুত্বপূর্ণ আধুনিক এলাকা। দুটি সি-বিচ, খেলার মাঠ, হোটেল রেস্তোরাঁ, দোকানপাট, ছোট বড় কটেজ নিয়ে আকর্ষণীয় ফিয়ারস্টদেন। তবে ফিয়ারস্টদেনের সবচেয়ে আকর্ষণ সাগরে শেষ বিকেলের স্নান ও ওল্যান্ড সেতুর উপর রাত দশটার সূর্যাস্ত দেখা।

(ক্রমশ)
স্টকহোম, সুইডেন
২৮-৭-২০২১


 নিউজটি পড়া হয়েছে ৩৩৮ বার  


 এই ধারাবাহিকের সকল পর্ব  

•   ওল্যান্ডের পথে-১


•   ওলান্ডের পথে- ২






 

ভ্রমণ

ওলান্ডের পথে- ২

লাদাখের ডায়রি- ১

ভ্রমণ বিভাগের আরো খবর





সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি:
আবদুল্লাহ আল হারুন
প্রধান সম্পাদক:
আসিফ হাসান (নূর নবী)

সম্পাদক ও প্রকাশক:
মো. জিয়াউল হক
বিশেষ সংবাদদাতা:
র‌বিউল ইসলাম সো‌হেল

আমাদের মানচিত্র

ঠিকানা: দেওয়ান কমপ্লেক্স (৩য় তলা), ৬০/ই/১, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
কক্ষ নং ১৪/সি, নোয়াখালি টাওয়ার (১৪ তলা), ৫৫-বি, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০

ফোন: ০১৯১৪-৭৩৫৮৫৮, ০১৯১৪-৮৭৫৬৪০
ইমেইল: editor@amadermanchitra.com, amadermanchitrabd@gmail.com

Location Map
Copyright © 2012-2021
All rights reserved

design & developed by
corporate work