ঢাকা, বাংলাদেশ  |  মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর ২০২১



  বিভাগ : গল্প তারিখ : ১৮-০৮-২০২১  


অপরাধ


  জয়শ্রি মোহন তালুকদার (মুনমুন)



জয়শ্রি মোহন তালুকদার (মুনমুন): ফুলি আজ বড়দের মতো কথার উওর দেয় অজিতবাবুর মুখের উপর। ফুলি বলে আর যদি একবার আমার বাবা মা তুলে গালি দেওয়া হয় তবে আমি আর আপনার বাসায় থাকব না। অজিতবাবু হতবাক হয়ে যায় ফুলির কথায়। সেই কবে নোওয়াপাড়া চা বাগান থেকে অজিত বাবুর বড় শ্যালক প্রদীপ বাবু তার বোনের বাসায় ফুলিকে এনে দিয়েছিল, ছোট্ট নাতি কাব্য'র সাথে খেলা করার জন্য। কাব্যকে দেখাশুনা করাসহ এখন অনেক কাজই করতে হয় ফুলিকে-যা ফুলির ভালো লাগে না।

পিরোজপুরের বিজয় নগর গ্রামে অজিত বাবুর বাস। পেশায় শিক্ষক। সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন অজিত বাবু। একমাত্র সন্তান অরিন্দমকে নিয়ে বিজয়নগরে প্রায় ১২ বছর যাবৎ বাস করছেন। যদিও বদলির চাকরি তবুও অজিতবাবু সিদ্ধান্ত নিয়েছেন শেষ জীবনটা তিনি পিরোজপুরে থাকবেন। অনেক আত্মঅহংকারী মানুষ তিনি। কলেজ থেকে ফিরে লেখালেখি করেন। অজিতবাবু বলেন লিখতে গেলে সাহিত্যের ছাত্র হতে হবে। আজকাল লেখালেখির যে মান হয়েছে। সবাই কবি হতে চায়। দুই কলম লিখেই ছাপিয়ে নেয় বই।

ফুলির সাথে অজিত বাবুর সম্পর্কটা একটু অন্যরকম। ফুলিকে দেখলেই তিনি রেগে যান। নাতি কাব্যর কারণেই ফুলির সকল বেয়াদবি মেনে নিতে হয়। চা বাগানে জন্ম হওয়ার কারণে ফুলি বড় ছোট সবাইকে তুই ডাকতে চায়। তার মনে থাকেনা কে তার চেয়ে বয়সে বড়। অজিত বাবুর পুত্রবধু কেয়া ফুলিকে খুব ভালোবাসে। সকালে ঘুম থেকে উঠেই ফুলি বলে বৌদিমুনি আমাকে চা দিস। চা না খাইলে মোর শরীরে শক্তি আয়না। কেয়া হাসে।

প্রতিবছর এই দিনটির জন্য অজিত বাবুর পরিবার অপেক্ষা করে। আজ ১১ জুলাই। কাব্যর আজ জন্মদিন। অনেক ভোরে আজ ফুলি ঘুম থেকে উঠেছে। পাড়ার ফুল গাছ থেকে ফুল আনতে বের হয়েছে সে। রাস্তায় পাড়া প্রতিবেশী যার সাথে দেখা হয় তাকেই ফুলি খুব খুশি হয়ে বলে এই শোন বাবু আজ মোর কাব্যর জন্মদিন। তোরা মোর কাব্যকে আশীর্বাদ দিবি বুঝলি। তোরা সোবাই রাতে চাইনিজে আসবি। আমি তোদের নিমন্ত্রণ দিচ্ছি। করোনার সময় মাস্ক পড়ে আসতে ভুলিস না কিন্তু।

বাড়িতে নারায়ণ পূজা চলছে। অজিতবাবু নিজে পূজা করছে। কেয়া ও গিন্নি মা পূজোর যোগাড় করে দিচ্ছেন। ফুলি বলেছে বৌদি মনি আমাকে কেউ খাইতে বুলিস না। দেবতা পূজা শেষ না হইলে আমি খাইবেক না। কেয়া কাব্যর প্রতি ফুলির এই ভালোবাসা দেখে অবাক হয়। আত্মীয় পরিজনসহ প্রায় ২৫ জনের আয়োজন করা হয়েছে রাতে চাইনিজে। এখানে ফুলিকে নিয়ে যাবার ইচ্ছা বাড়ির কারো ছিল না। কেয়া বলেছে অরিন্দমকে ফুলি কাব্যকে দেখাশুনা করে সারাদিন। ফুলি যদি না যায় তাহলে সেও যাবে না।

বিজয় নগর গ্রাম থেকে শহরের দূরত্ব প্রায় ১৫ মিনিটের রাস্তা। শহরের চৌরাস্তায় নামকরা চাইনিজ রেস্টুরেন্ট। ১০ পাউন্ডের একটি কেক নিয়ে অরিন্দম, কেয়া- কাব্যকে নিয়ে চাইনিজে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফুলি জেদ ধরেছে সে যাবে। কিন্তু অজিত বাবুর একদম ইচ্ছে নেই। ফুলি বলে অজিতবাবুকে তোদের যাবার দরকার নেই তোরা ঠাকুর মানুষ। ঐ জায়গায় মুরগি হবে। তোরা বাসায় থাক। বাড়ি পাহাড়া দে। আমাকে যাইবার দে। আমি না গেলে কাব্য কাঁদবে বুঝলি।

কেক কাটা হবে। নিমন্ত্রিত সব অতিথি এসেছে। কেয়া অরিন্দম যখন কাব্যকে নিয়ে কেক কাটতে যাচ্ছে ঠিক সেই সময়ে পিছন থেকে বৌদিমুনি আমাকে আসতে দে। আমাকে কাব্যর হাত ধরে কেক কাটতে দে। ফুলির কন্ঠস্বর। সবাই যে যার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। কে এই মেয়ে? অজিতবাবুর রাগান্বিত কন্ঠস্বর তুই যাবি না। ফুলির পাল্টা উত্তর আমি যাব। তুই এখানে এসেছিস কেন? যা তুই। বয়স হয়েছে বাড়িতে থাকবি। পরিস্থিতি অন্যরকম। কেয়া সামলিয়ে নিল সবকিছু। পরিচয় করিয়ে দিল সবার সাথে ফুলি কাব্যর বাগানের পিসি। কাব্যর সাথে খেলা করে। ফুলির মুখে ফুটে উঠল আনন্দের হাসি।

অরিন্দম ও কেয়ার বিয়ে হয়েছে প্রায় ৬ বছর হতে চলেছে। তারা দুজন দুজনকে খুব ভালো করে বোঝে। কারো মনের কথা কেউ না বললেও বুঝতে পারে। কেয়ার ইচ্ছে সে কিছুদিন তার মায়ের কাছে গিয়ে থাকবে। গতবছর তাঁর বাবা মারা যাবার পর থেকে মায়ের শরীরটা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। কেয়ার বাপের বাড়িতে যাবার কথা শুনা মাত্রই অজিতবাবু স্থির থাকতে পারছে না আজ। নাতি কাব্যকে ছেড়ে সে থাকতে পারবে না। কেয়াকে গিন্নি মা বলেছে এই করোনার সময় তাদের ইচ্ছে নেই নাতিকে ঘরের বাইরে বের করা। কেয়ার মনের অবস্থা খুব খারাপ। সারাদিন সে মায়ের জন্য কান্নাকাটি করে। ফুলি কেয়ার চোখের জল একদম সহ্য করতে পারে না। কেয়ার মধ্যে সে তার মা শেফালীকে দেখে। কেয়ার চোখে দেখে সে মায়ের স্নেহ।

আজ বেশ কিছু দিন ধরে অজিতবাবু ও ফুলির মধ্যে সম্পর্কটা খুবই খারাপ চলছে। অজিত বাবুর সব কথার মুখে মুখে উত্তর দেয় ফুলি। জোরে জোরে সবাইকে শুনিয়ে বলে তোর নাতিকে চাইনিজে নিয়ে গিয়ে জন্মদিন করছিস, গিন্নী মা সিলেটে যাচ্ছে তার বাপের বাড়ি আর বৌদিমুনি তার বাপের বাড়ি বাগেরহাটে যেতে চাইলেই করোনার ভয়। তোরা একদম তোর ছেলের বউকে ভালোবাসিস না। চল গিয়ে দেখবি নোওয়াপাড়া বাগানে আমাদের বড়বাবু তারান তার ছেলের বউকে কতো ভালোবাসে। অজিতবাবুর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। তিনি বলেন আজ অরিন্দম আসলে এর একটা বিহিত করতে হবে।

সোনালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার অরিন্দম। বাগেরহাটে যখন ছিলেন তখন কেয়ার সাথে বিয়ে হয়। বাবা মায়ের পছন্দেই অরিন্দম বিয়ে করেন। আজ অফিস থেকে ফেরার পরে বাবার কাছ থেকে তাকে অনেক কথাই শুনতে হয়েছিল ফুলিকে নিয়ে। তিনি সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না কি করবেন? রাতে চোখে ঘুম আসে না। ফুলির কথা মনে পড়ে। গতবছর মার্চ মাসে যখন কেয়ার করোনা হয়ছিল তখন ফুলি নিজের জীবনের ভয় না করে যে সেবা করেছিল তা কখন ভোলার নয়। স্বামী হয়েও সে সেটা করতে পারেনি। কাব্য’র প্রতি ফুলির অকৃত্রিম ভালোবাসা সবার চোখে পড়ে। কিন্তু কেন সেই ছোট্ট মেয়েকে তার বাবা ভালোবাসে না এটা সে মেনে নিতে পারছে না। ফুলির মধ্যেই অরিন্দম খুঁজে পায় তাঁর বোনকে।

মাএ ৮ বছর বয়সে অজিতবাবুর একটি মেয়ে মারা গিয়েছিল। সেই থেকেই তিনি একটু অসামাজিক। প্রত্যেকদিনের মতই ফুলি ঘুম থেকে উঠে আর হরে কৃষ্ণ গান গায়। তারপর চলে সারাদিন তার পছন্দের এক গান। সে এখন জানে না আজ তার জীবনে কি ঘটতে চলেছে।

ফুটবল খেলা দেখতে তার খুব ভালো লাগত। পাড়ার বেশকিছু মানুষ আর্জেনটিনা ও ব্রাজিলের ফাইনাল খেলা দেখবে অজিতবাবুর বাসায়। ফুলির খুব আনন্দ। সে অরিন্দমকে বলেছে দাদা বাবু আমি আর্জেনটিনার পক্ষে। যদি আমার দল জিতে তাহলে তুই মেসির একটা ছবি আমাকে এনে দিবি। আমি যখন বাড়িতে যাব তখন ওকে সঙ্গে নিয়ে যাব। দেয়ালে ওর ছবি লাগিয়ে রাখব। দিবি তো বল। অরিন্দম হেসে বলেছিল তোকে দশটা ছবি কিনে দেব। ফুলি বলেছিল এই না হলে আমার দাদাবাবু।

খেলা জমে উঠেছে। আর্জেনটিনা একটা গোল দিয়েছে। গিন্নি মা চা তৈরি করছে সবার জন্য। কেয়াকে বলেছে খেলা দেখার জন্য। ফুলি খেলা দেখছে আর সবার হাতে হাতে চা এনে দিচ্ছে। অজিতবাবুর জন্য জল আনতে গিয়ে ফুলি দেখে গিন্নি মায়ের শাড়িতে গ্যাসের চুলা থেকে আগুন ধরেছে। ফুলি চিৎকার দেয় আগুন আগুন। তোরা কে কোথায় আছিস। আমার গিন্নি মাকে বাঁচা। ফুলি সবার জন্য অপেক্ষা না করে গিন্নি মাকে ফেলে দিয়ে শাড়ি খুলে নেয়। শরীরের কিছু অংশ পুড়ে যায় গিন্নি মার। কিন্তু সবাই যখন আসে তখন ফুলি জ্বলছে আগুনে।

আগুনে পুড়ে যাওয়া ফুলিকে খুব তাড়াতাড়ি নেওয়া হয় পিরোজপুর সরকারি হাসপাতালে। কিন্তু সেখানকার কর্তব্যরত ডাক্তাররা কিছুই করতে পারে নি। তার আগেই ফুলি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করে।

বিজয়পুর গ্রামের সব মানুষ দেখেছিল ফুলির প্রতি অরিন্দম ও কেয়ার ভালোবাসা। রক্তের কোন সম্পর্ক নেই ফুলির সাথে কিন্তু সেদিন দেখে সবার মনে হয়েছিল ফুলি অরিন্দমের ছোট বোন। নোওয়াপাড়া চা বাগানের মধ্য দিয়ে ফুলির লাশ নিয়ে যাওয়া হয় তার বাড়িতে। চিতার আগুন না নেভা পর্যন্ত অজিত বাবু কারো সঙ্গে কোন কথা বলেনি। শেষ সময়ে ঈশ্বরের কাছে তার প্রার্থনা ছিল নিজের জীবনের বিনিময়ে ফুলিকে ফিরিয়ে দেয়া। ফুলির মধ্যে দেখে সে তার মেয়েকে। অপরাধের জন্য ক্ষমা চায় ঈশ্বরের কাছে। মনে পড়ে অজিতবাবুর ফুলির সেই প্রিয় গান যেটা সে সারাদিন গাইত

তুই যে আমার পুতুল পুতুল সেই ছোট্ট মেয়ে

যাকে নিয়ে স্বপ্ন আমার ঝরতো দু’চোখ বেয়ে।


 নিউজটি পড়া হয়েছে ১১২ বার  






 

গল্প


গল্প বিভাগের আরো খবর





সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি:
আবদুল্লাহ আল হারুন
প্রধান সম্পাদক:
আসিফ হাসান (নূর নবী)

সম্পাদক ও প্রকাশক:
মো. জিয়াউল হক
বিশেষ সংবাদদাতা:
র‌বিউল ইসলাম সো‌হেল

আমাদের মানচিত্র

ঠিকানা: দেওয়ান কমপ্লেক্স (৩য় তলা), ৬০/ই/১, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
কক্ষ নং ১৪/সি, নোয়াখালি টাওয়ার (১৪ তলা), ৫৫-বি, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০

ফোন: ০১৯১৪-৭৩৫৮৫৮, ০১৯১৪-৮৭৫৬৪০
ইমেইল: editor@amadermanchitra.com, amadermanchitrabd@gmail.com

Location Map
Copyright © 2012-2021
All rights reserved

design & developed by
corporate work