ঢাকা, বাংলাদেশ  |  মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর ২০২১



  বিভাগ : সংবাদ বিশ্লেষণ তারিখ : ১৮-০৮-২০২১  


পৃথিবীকে বাঁচানোর সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে দ্রুত!


  আসিফ হাসান



 

আসিফ হাসান: মানুষের কারণে জলবায়ুর মারাত্মক পরিবর্তন ঘটেছে। সামনে আরও ধ্বংসাত্মক পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে। জলবায়ু বিষয়ে এতদিন ধরে বিজ্ঞানীদের এমন মন্তব্য ও আশঙ্কা পুরোপুরি সত্য এবং এতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। গত ৯ আগস্ট ২০২১ তারিখে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে এযাবতকালের সবচেয়ে বিস্তৃত ও বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে প্রকাশিত এ যাবৎকালের সর্ববৃহত গবেষণায় জানানো হয়েছে এমন সতর্কতা আর আহবান। এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের সংস্থা ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি)। দেশে করা বিজ্ঞানীদের বহু গবেষণার সারাংশ এই প্রতিবেদন।

জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ৪২ পৃষ্ঠার এ প্রতিবেদনটিকে ‘মানবতার জন্য লাল সংকেত’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন, দেরি করার মতো সময় আমাদের হাতে নেই। নেই কোনো অজুহাত দেখানোরও জায়গা। আসন্ন গ্লাসগো জলবায়ু সম্মেলন সফল করার জন্য সব দেশের সরকার ও অংশীদারদের ভরসায় রয়েছি।

বিশ্বের এক প্রান্তে খরা আবার অন্যপ্রন্তে বন্যা। একদিকে ঠান্ডা অন্য কোথাও পুড়ছে দাবানলে। উত্তরের বরফ পানি গলে ডুবতে বসেছে দক্ষিণের একাংশ। এত কিছুর জন্য সবচেয়ে দায়ী প্রাণ প্রকৃতির প্রতি মানুষের অনাচার। এই প্রতিবেদনে এবার হাজার হাজার বিজ্ঞানীর গবেষণা মানবজাতিকে জানিয়ে দিলো পৃথিবী নামের এই গ্রহটাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে, নিজেদের বাঁচতে হলে নষ্ট করার মত সময় আর হাতে নেই। এখনই সজাগ হতে হবে, সোচ্চার হতে হবে জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে। পৃথিবীকে বাঁচানোর এটাই শেষ সুযোগ।

জলবায়ু ইস্যুতে বিজ্ঞানভিত্তিক পর্যালোচনার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৮৮ সালে গঠিত হয় আইপিসিসি। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বায়ুমণ্ডল থেকে শুরু করে সমুদ্র ও ভূপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধি মূলত মানুষের কারণেই হয়েছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ১৯৭০ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত গত ৫০ বছরে যে হারে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়েছে গত দুই হাজার বছরের মধ্যে তেমনটি কখনই ঘটেনি। আর এর ফল ইতোমধ্যে নানা দুর্যোগের মধ্য দিয়ে পৃথিবীবাসী ভোগ করতে শুরু করেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তা উল্লেখ করে পরিবেশ ও পানি বিশেষজ্ঞ ড. এ আতিক রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের একটা চরম ক্ষতিগ্রস্ত দেশ। উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। এতে দক্ষিণের উপকূলীয় অঞ্চল ডুবে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছে। দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে। বহু এলাকার মানুষ থাকতে পারছে না। মানুষকে স্থানান্তর করতে হচ্ছে। মানুষ তার ঘরবাড়ি হারিয়ে ফেলছে। লবণাক্ততার জন্য ধানসহ কৃষিজাত ফসল হচ্ছে না।

জলবায়ুবিষয়ক প্রতিবেদনটিতে যেসব গুরুত্বপূর্ণ দিক চিহ্নিত করা হয়েছে, তারমধ্যে প্রথমেই উল্লেখ করা হয়েছে ১৮৫০ সাল থেকে রেকর্ড করা তথ্যানুযায়ী গত পাঁচ বছরই ছিলো বিশ্বের সবচেয়ে গরম সময়। আর ১৯০১ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হার তিন গুন বেড়ে গেছে। এছাড়া ১৯৯০ এর দশক থেকে মেরু অঞ্চলে যেহারে বরফ গলছে, তার ৯০ ভাগই হচ্ছে মানবঘটিত কারণে। এসবের জন্যই নজিরবিহীনভাবে বর্তমানে গ্রিস ও তুরস্কে দাবানল ছড়িয়ে পড়ছে। সম্প্রতি জার্মানি আর চীনের বন্যার যে রূপ দেখা গেছে, অদূর ভবিষতে তেমনটি আর দেখা যায় নি। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাবে। সমুদ্র আরও গরম আর আর্দ্রীয় হয়ে উঠবে। উপকূলীয় এলাকাগুলো খুব দ্রুত তলিয়ে যেতে শুরু করবে।

বৈশ্বিক বিপর্যয় ঠেকাতে ২০১৫ সালে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি হয়েছে। এই চুক্তিতে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রই স্বাক্ষর করেছে। চুক্তি বাস্তবায়িত হলে, এই শতাব্দির শেষের দিকে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে আটকে রাখা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়। তবে সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই লক্ষ্যমাত্রা ঠিক থাকবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা দুই দশকেরও কম সময়ের মধ্যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১ দশমিক পাঁচ পর্যন্ত বেড়ে যাবে। আর সামনের বছরগুলোতে যদি নিঃসরণ কমানো যায়, তবে এই বৃদ্ধি ধারণার চেয়েও আগে হতে পারে। এ ধরনের অনুমান অবশ্য ২০১৮ সালেই করেছিলো আইপিসিসি। এই অবস্থার জন্য মানুষকেই দায়ী করা হয়েছে প্রতিবেদনে। জলবায়ু ইস্যুতে আসন্ন কপ-২৬ সম্মেলন সফল করতে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহবান জানান জাতিসংঘ মহাসচিব। আগামী নভেম্বরের শুরুতেই স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোয় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এই সম্মেলন।

এতদিন ধরে বিজ্ঞানীরা এসব বিষয়ে তাদের নানা গবেষণা ও পূর্বাভাস প্রকাশ করে আসছিলেন। এবার জাতিসংঘের উদ্যোগে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য কয়েক হাজার গবেষণার তথ্য নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। আইপিসিসি বিভিন্ন দেশের সরকারের সম্মিলিত উদ্যোগে গঠিত জলবায়ু বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষ শাখা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মানুষের কারণে এমন কিছু পরিবর্তন সাধিত হয়েছে যা আর সমাধানযোগ্য নয়। তবে ভবিষ্যতের ক্ষয়ক্ষতি এখনও ঠেকানো সম্ভব। ঝুঁকি এড়াতে হলে খুব দ্রুতগতিতে এই দশকের মধ্যেই গ্রিনহাউজ গ্যাসের নিঃসরণ ব্যাপক মাত্রায় কমাতে হবে।

১৪ হাজারের বেশি বৈজ্ঞানিক গবেষণার উপর ভিত্তি করে প্রতিবেদনটিতে জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশে পরিবর্তন আনছে এবং সামনে কী হতে পারে তার সবচেয়ে বিস্তৃত এবং বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়। উল্লেখ্য, স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরে এ বছরের শেষের দিকে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। ওই সম্মেলনের তিন মাস আগে এ প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হলো।

কিছুদিন আগেও বলা হচ্ছিল, পৃথিবীকে বাঁচাতে আর সময় আছে মাত্র ১২ বছর। কিন্তু এখন বলা হচ্ছে- না, ১২ বছর নয়, সামনের দেড় বছর হচ্ছে পৃথিবীকে রক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যা করার করতে হবে এর মধ্যেই। জলবায়ুর পরিবর্তন বিষয়ে জাতিসংঘের বিজ্ঞানীদের একটি টিম, ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) গত বছর বলেছিল, যদি এই শতকের মধ্যে আমরা তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ধরে রাখতে চাই, তাহলে ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নির্গমন ৪৫ শতাংশ কমাতে হবে। কিন্তু এখন অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, অতটা সময় আর হাতে নেই। কার্বন নির্গমন কমাতে একেবারে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হবে ২০২০ সালের আগেই।

এই যে পৃথিবীকে রক্ষার জন্য ২০২০ সালকে শেষ সময়সীমা বলে ধরে নেয়া হচ্ছে, সেটা বিশ্বের কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় জলবায়ু বিজ্ঞানী প্রথম ঘোষণা করেন ২০১৭ সালে। ‘জলবায়ু বিষয়ক অঙ্কটা বেশ নির্মমভাবেই স্পষ্ট এখন। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে হয়তো পৃথিবীর ক্ষত সারিয়ে তোলা সম্ভব নয়, কিন্তু আমাদের অবহেলার মাধ্যমে আরো অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে, ‘বলছেন জলবায়ু বিজ্ঞানী এবং পটসড্যাম ক্লাইমেট ইনস্টিটিউটের হ্যান্স জোয়াকিম শেলনহুবার।

ব্রিটিশ যুবরাজ চার্লসও সম্প্রতি কমনওয়েলথ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক বৈঠকে একই কথা বলেছেন। ‘আমার দৃঢ় মত হচ্ছে, আগামী কয়েক মাসেই নির্ধারিত হবে আমরা জলবায়ুর পরিবর্তনকে আমাদের টিকে থাকার মাত্রায় আটকে রাখতে পারবো কীনা। আমাদের টিকে থাকার জন্য প্রকৃতিতে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে পারবো কীনা।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০১৫ সালে যে প্যারিস জলবায়ু চুক্তি হয়েছিল, তারপর থেকে কিন্তু তর্ক-বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে এই চুক্তির একটি ‘রুলবুক’ তৈরির জন্য। কিন্তু চুক্তির শর্ত অনুযায়ী এতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো এমন অঙ্গীকারও করেছিল যে তারা ২০২০ সালের মধ্যে কার্বন নির্গমন কমাতে আরও ব্যবস্থা নেবে।

গত বছর আইপিসিসির রিপোর্টে একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ টার্গেট ঠিক করা হয়েছিল, যা কিন্তু সেভাবে আলোচিত হয়নি। সেটি হচ্ছে, কার্বন নির্গমন বাড়ার হার ২০২০ সালেই থামিয়ে দিতে হবে, যাতে তাপমাত্রা এই শতকে এক দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি আর না বাড়ে। কিন্তু এখন পর্যন্ত যে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে, তা কোনভাবেই তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে নিরাপদ সীমার মধ্যে ধরে রাখতে পারবে না। চলতি শতকের শেষ নাগাদ তাপমাত্রা হয়তো তিন ডিগ্রি পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাগুলো সাধারণত পাঁচ বা দশ বছর মেয়াদী। কাজেই ২০৩০ সাল নাগাদ যদি কার্বন নির্গমন ৪৫ শতাংশ কমাতে হয়, সেই পরিকল্পনা টেবিলে হাজির করতে হবে ২০২০ সাল শেষ হওয়ার আগেই।

জাতিসংঘ মহাসচিব বেশ খোলাখুলিই বলেছেন, কোন দেশ যদি তাদের কার্বন নির্গমনের মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর প্রস্তাব করতে পারে, তবেই যেন তারা আসন্ন গ্লাসগো সম্মেলনে আসে। এটা সত্যি যে জলবায়ুর পরিবর্তনের বিষয়ে মানুষের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। কীভাবে এর সমাধানে নিজেরা কিছু করা যায়, সেটা নিয়ে ভাবছে অনেকে। একইসঙ্গে ঘটা বেশ কিছু ঘটনা হয়তো এর পেছনে কাজ করছে। প্রথমত, ইউরোপজুড়ে তাপপ্রবাহ যে হারে বাড়ছে তার অনেক প্রমাণ এখন পাওয়া যাচ্ছে। সুইডেনের স্কুলছাত্রী গ্রেটা থানবার্গের আন্দোলন অনেককে উজ্জীবিত করেছে। আর ‘এক্সটিংশন রেবেলিয়ন’ নামের বিপ্লবী পরিবেশবাদী গোষ্ঠীর আন্দোলনও জনমতকে প্রভাবিত করেছে।

মানুষ এখন এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানাচ্ছে। অনেক দেশেই রাজনীতিকরাও এখন এটা নিয়ে সচেতন হয়ে উঠেছেন। বিপ্লবী পরিবেশবাদী গোষ্ঠীগুলোর আন্দোলন জলবায়ুর পরিবর্তন বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণে সফল হচ্ছে।

তথ্যসূত্র ও ছবি: বিবিসি অনলাইন এবং জাতিসংঘের তথ্য পোর্টাল


 নিউজটি পড়া হয়েছে ১১৪ বার  






 

সংবাদ বিশ্লেষণ

১৫ আগস্ট ট্রাজেডি: বঙ্গভবন ও ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের অজানা অধ্যায়

সংবাদ বিশ্লেষণ বিভাগের আরো খবর





সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি:
আবদুল্লাহ আল হারুন
প্রধান সম্পাদক:
আসিফ হাসান (নূর নবী)

সম্পাদক ও প্রকাশক:
মো. জিয়াউল হক
বিশেষ সংবাদদাতা:
র‌বিউল ইসলাম সো‌হেল

আমাদের মানচিত্র

ঠিকানা: দেওয়ান কমপ্লেক্স (৩য় তলা), ৬০/ই/১, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
কক্ষ নং ১৪/সি, নোয়াখালি টাওয়ার (১৪ তলা), ৫৫-বি, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০

ফোন: ০১৯১৪-৭৩৫৮৫৮, ০১৯১৪-৮৭৫৬৪০
ইমেইল: editor@amadermanchitra.com, amadermanchitrabd@gmail.com

Location Map
Copyright © 2012-2021
All rights reserved

design & developed by
corporate work