ঢাকা, বাংলাদেশ  |  মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর ২০২১



  বিভাগ : ভ্রমণ তারিখ : ০২-০৯-২০২১  


ওলান্ডের পথে- ২


  লিয়াকত হোসেন




লিয়াকত হোসেন:

পরদিন পাখিডাকা ভোরে ঘুম ভাঙ্গলো।
দরজা খুলে বেরিয়ে এলাম। দরজায় কোন তালাচাবি নেই, শুধু কোড নাম্বার। বাড়ির বাগানে পাখিরা ডাকাডাকি করে পাকা বেরি খাচ্ছে। বাড়ির পেছনে খোলা গুদামঘর। দরজা জানালা নেই। তিনটি সাইকেল অবহেলায় পরে আছে। প্রয়োজনে যে কেউ সাইকেলে দ্বীপ ঘুরে আসতে পারেন। পেছনের পায়ে চলা পথটি খোলা লোহার ফটক পেড়িয়ে বড় রাস্তায় মিশেছে। বড় রাস্তার দুপাশেই গাছ গাছালিতে ভরা ভিলা ও বসতবাড়ি। প্রতি বাড়ির সম্মুখে ও পেছনে ফুলের বাগান। বাড়ির পেছনদিকটা ঘুরে সামনে এলাম। দুটি বিশাল উইন্ড মিল বাড়ির সামনে।

উইন্ড মিল

উইন্ড মিল
পাঁচ থেকে ছয়শ শতাব্দীতে পার্শিয়ানরা প্রথম উইন্ড মিল ব্যবহার শুরু করে।
বায়ু শক্তি হতে বিশাল পাখা ঘুরিয়ে গম জব ও খাদ্যদ্রব্য পেশা বা গুড়ো করা হতো। ক্রমে উইন্ড মিলের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। জল তোলা ও বিদ্যুত তৈরির কাজেও উইন্ড মিলের ব্যবহার শুরু হয়। পৃথিবীর বড় উইন্ড মিল সান্ডভিক কর্ণ ওলান্ডে অবস্থিত ওলান্ডের পশ্চিমে সমুদ্রতীরবর্তী সান্ডভিক গ্রামে, গ্রামের নামে নাম। ১৮৫৬ সালে স্মোল্যান্ড প্রদেশের ভিমারবিতে প্রথম নির্মিত হয় উইন্ড মিলটি। প্রচন্ড ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হলে ১৮৮৫ সালে বিক্রি করে দেয়া হয়।  নতুন মালিক মিলটি খন্ড খন্ড করে খুলে সান্ডভিক গ্রামে নিয়ে এসে পুর্নস্থাপন করেন। মিলটি ১৯৫০ সাল পর্যন্ত কর্মক্ষম ছিল। বর্তমানে সরকারি পুরাতত্ত¡ বিভাগ দায়িত্ব নিয়ে টুরিস্ট স্পট গড়ে তুলেছে। ওলাল্ডজুড়ে প্রায় দুই হাজার উইন্ড মিল কার্যকর ছিলো। উনিশ শতকের শেষের দিকে সান্ডভিক কর্ণের প্রভাবে প্রায় সবগুলো পরিত্যক্ত হয়। তবে এখনো ওলান্ডে ৩৫০ টি উইন্ড মিল বর্তমান রয়েছে।

 

সাগর স্নান

সাগর স্নান
আজ আমরা দুপুরে লাঞ্চের পর সাগর স্নানে যাবো। রৌদ্রউজ্জ্বল গরম দিন। বাতাস হালকা গরম। সাগর স্নানের কথা শুনেই আলিয়া আইয়ান বিছানা ছেড়ে লাফিয়ে নেমে লাঞ্চ সেরে তৈরি হয়ে নিল। আমরাও পোশাক পালটে নিলাম। যেতে হবে লিকসান্ড (Lycksand)বিচে। উত্তর ওলান্ডে পঁয়তাল্লিশ মিনিট ড্রাইভ। লিকসান্ড বিচের বৈশিষ্ট্য হালকা সাদা বালুকনার সাগর সৈকত। স্বচ্ছ নীল জল, সাগরের বহুদূর অবধি যাওয়া যায়। বীচে বে-ওয়াচের মত সাগর রক্ষী নেই তবে জলের গভীরে কতটুকু যাওয়া যাবে সে সীমানা দেয়া। সীমানার ওপারে স্পিড বোর্ড ও ছোট বড় জলযানের চলাচল পথ। সাগর সৈকতে কোন গাছপালা নেই, ছায়ার ব্যবস্থা নেই। যারা স্নান ব্যতিরেকে সৈকত উপভোগে আসেন তাতে কোন অসুবিধে নেই, শুধু সঙ্গে আনতে হবে হালকা পাতলা সৈকত কেদারা আর রোদ থেকে বাঁচার বহনযোগ্য তাবু। সঙ্গে পানীয়, হালকা খাবার তবে যাবার সময় পানীয় বোতল ও খাবারের পরিত্যক্ত প্যাকেট কুড়িয়ে নিয়ে যেতে হবে।
আইসল্যান্ডের কালো বালির সৈকতের কথা শুনেছি, দেখা হয়নি।
অস্ট্রেলিয়ায় মোটা বালির সৈকত দেখেছি। এবার হালকা বালির সৈকতে যাত্রা। লিকসান্ডে যখন পৌঁছালাম তখন বেলা দুইটা। বার্চ বনের ভেতর পার্কারিং। পাথরকুঁচির পথ। পথের পাশে বিচ টয়লেট। একটু দূরেই ছোট কিয়স্ক, শীতল পানীয় জলের দোকান। বনের ভেতর কাঠের পাটাতনের রাস্তা। রাস্তা শেষ হয়েছে সৈকতে। আমরা পাটাতনের পথ পার হয়ে তপ্ত বালিতে নেমে এলাম। সৈকতে স্নানার্থীর সমাগম। তপ্ত বালিতে অনেকেই তোয়ালে বিছিয়ে সূর্যস্নানে। সম্মুখে নীল জলের হাতছানি। ঐ হাতছানি উপেক্ষা করা কঠিন। আমরা সবাই জলে ঝাপিয়ে পরলাম। জল হালকা গরম। সাগরের গভীর থেকে ঢেউ আছড়ে পড়ছে তটে। আমরা ঢেঊয়ের উপর নিজেদের ছেড়ে দিলাম। যারা সাঁতার জানেনা তারাও এখানে সাঁতার শিখে যাবেন। আলিয়া সাঁতার জানে, ছোট আইয়ানও চেষ্টার পর হাতপা ছোড়া শিখে গেল। সাগর থেকে যখন উঠে এলাম তখন ঘড়ির কাঁটা পাঁচটার কাছাকাছি। সূর্যের তেজ কমেনি। ছোট আইয়ান আলিয়া সৈকতে বালির পাহাড় তৈরি করে আবার জলে ঝাপিয়ে পরল।

 

বরিহল্ম দুর্গ

বরিহল্ম দূর্গ
ওলান্ড দ্বীপের অন্যতম আকর্ষণ বরিহল্ম দুর্গ।
সুইডেনের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে বরিহল্ম দূর্গ প্রশংসার দাবীদার। প্রায় ৯০০ শত বছরের ইতিহাসে আবর্তিত দূর্গ। জলদস্যুদের প্রকোপ হতে দেশ রক্ষার্থে ১২ শতকে নির্মিত হয় বিশাল দূর্গটি। ১৪ শ থেকে ১৫শ শতকে দূর্গটিকে ব্যবহার করা হয় রাজকীয় সেনাবাহিনীর ঘাঁটি হিসেবে। ১৭শ শতকে কালমার যুদ্ধে দূর্গটির অপুরণীয় ক্ষতি হলে ১৮ শতকে দূর্গটি সামরিক গুরুত্ব হারিয়ে পরিত্যক্ত হয় ও অগ্নিকান্ডে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরে। বর্তমানে দূর্গটি ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে গুরুত্ব পেয়েছে।


ইতিহাস আরো একটু আছে
১৪শ শতকে বরিহল্মের শাসনকর্তা ছিলেন নরওয়ের রাজকন্যা ও সুইডিশ ডিউক ভলডেমারের বিধবা স্ত্রী ইঙ্গেবর। স্বামীর মৃত্যুর পর ইঙ্গেবর ‘ডাচেস অব ওলান্ড‘ হিসেবে প্রায় চল্লিশ বছর ওলান্ড শাসন করেন এবং ১৩৫৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর বরিহল্ম নর্ডিক রাজীতিতে প্রাধান্য বিস্তার করে ও জার্মান ব্যবসায়ীদের বানিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়। কালক্রমে বরিহল্মসহ ওলান্ড দ্বীপটি সুইডেনের অধিকারে আসে।
রাজারা সাধারণত খামখেয়ালী হয়ে থাকেন।

এক পা কাটা কুকুর
সুইডিশ রাজারাও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। মাত্র ৩২ বছর বয়েসে তৃতীয় ইউহান রাজা হয়েই ১৫৬৯ সালে ঘোষণা দেন সমগ্র ওলান্ড দ্বীপটি রাজকীয় শিকার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহৃত হবে। ওলান্ডবাসী শিকারে অংশ নিতে পারবে না তবে দর্শক হিসেবে বাধ্যতামূলকভাবে উপস্থিত থাকবে। দ্বীপবাসির কুকুরগুলো যাতে রাজকীয় শিকারে বাঁধার সৃষ্টি না করে সেদিক বিবেচনা করে দ্বীপের কুকুরগুলোর চার পায়ের একটি পা কেটে দেয়া হল। রাজকীয় শিকারে শুধু রাজকীয় কুকুর ব্যবহৃত হবে।
রাজকীয় শিকারে ওলান্ডবাসীদের উপর দুর্যোগ নেমে আসে। ১৬৭৩ সালে সুইডিশ রাজা এগারতম কার্ল রাজকীয় বাহিনী নিয়ে শিকারে এলেন। সঙ্গে বন্ধু বান্ধব পাইক পেয়াদা সৈন্যসামন্তসহ ৫০০ জনের বিরাট বাহিনী। সে সময় ওলান্ডের জনসংখ্যা ছিলো খুবই স্বল্প ভূমিহীন কৃষক। ৫০০ শত বাহিনীর খাদ্য যোগানে ওলান্ডবাসীর সামর্থ্য না থাকায় তাদের গরু ছাগল ভেরা গৃহপালিত পশুসহ সব কিছু কেড়ে নেয়া হল। রাজ হুকুম বলে কথা!
আমরা যখন ঐতিহাসিক স্থানটি দেখতে এলাম তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে।
বরিহল্ম দুর্গ ভাঙ্গা কাঠামো ও ইতিহাস নিয়ে যুগের পর যুগ দাঁড়িয়ে আছে। সিড়ি দিয়ে ভাঙ্গা দুর্গের কয়েকতলা উপরে যাওয়া যায়। বিশাল দুর্গের একাংশে জাদুঘর। জাদুঘরে পুরা কালের তৈজসপত্র। শিকারের ধনুক ও পা কাটা কুকুরের প্রতিকৃতি। সুইডিশরা ইতিহাস লুকায়নি, ইতিহাস থেকে তারা শিক্ষা নিয়েছে।


সলিডেন প্যালেস
বর্তমান সুইডিশ রাজপরিবারের গ্রিস্মকালীন রাজবাড়ি।

সলিডন প্যালেস
খুবই সাধারণ রাজপরিবারের সাধারণ রাজবাড়ি। কোনো পাইক পেয়াদা নেই, কোনো সৈন্য সামন্তও নেই।  রাজবাড়ি না বলে ভিলা বলা ভালো। সবুজ ফুলের বাগানের মাঝে তিনতলা ইটালিয়ান স্টাইলের ভিলা। ওলান্ড সাধারণত শুস্ক হলেও এদিকটায় সবুজের সমারোহ। বাড়ির পেছনেই মধ্যযুগীয় ইটালিয়ন স্টাইলের বাগান, বাগানের ভেতর নুড়ি বিছানো আঁকাবাঁকা পথ। পথের দুপাশে মনোরম ফুলের বাগান। দক্ষিণে ইংলিশ পার্ক। পশ্চিমে ডাচ গার্ডেন। রাজবাড়ির আঙ্গিনা ও বাগানে সর্বসাধারনের অবারিত প্রবেশ। তবে বাড়ির ভেতর নয়।
বরিহল্ম দুর্গের কাছেই সলিডেন।

আমরা গাড়ি ঘুরিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে সলিডেনে পৌঁছালাম। পড়ন্ত বিকেল। ছোট সেতু পেরিয়ে রাজবাড়ির আঙ্গিনা। আমাদের ছাড়াও বেশ কয়েকজন দর্শনার্থী। সবাই ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছেন, মোবাইলে ছবি নিচ্ছেন। রাজবাড়ির সামনে কাঁকরবিছানো ছোট পথ। হাঁটলে পায়ের শব্দ উঠে। একমনে রাজবাড়ি ও বাগানের ছবি তুলছিলাম। কাঁকর পথে গাড়ির শব্দ। একটি কালো রঙ্গের মাঝারি গাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে পেছন হতে। গাড়িকে যায়গা দিতে সবুজ ঘাসে নেমে এলাম। গাড়িটি খুব ধীরে ধীরে সামনে এলো। তাকালাম, কিন্তু একি! প্রিন্স ফিলিপ! রাজার ছোট সন্তান। গাড়ির সঙ্গে কোন বহর নেই, কোন পাইক নেই পেয়াদা নেই। এমনকি ড্রাইভারও নেই। প্রিন্স ফিলিপ নিজেই ড্রাইভ করছেন, ভেতরে স্ত্রী রাজকুমারী সোফিয়া ও তাদের দুই সন্তান। প্রিন্স ফিলিপ ধীরে গাড়ি চালিয়ে রাজবাড়ির অঙ্গিনায় পার্ক করে পেছনের হুড খুলে লাগেজ কাঁধে উঠিয়ে নিলেন আর রাজকুমারী সোফিয়া দু’সন্তানের একজনকে কোলে উঠিয়ে অন্যজনের হাত ধরে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করলেন। যাবার আগে হাত উঁচিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে ভুললেননা।


দৃশ্যটি অভাবনীয় তবে সুইডিশ রাজপরিবার বলেই সম্ভব।
কুকুরের পা কাটার প্রতাপ বহু আগেই বিলীন হয়েছে।


স্টকহোম
২৮-৭-২০২১


 নিউজটি পড়া হয়েছে ১৭৮ বার  


 এই ধারাবাহিকের সকল পর্ব  

•   ওলান্ডের পথে- ২






 

ভ্রমণ

ওল্যান্ডের পথে-১

লাদাখের ডায়রি- ১

ভ্রমণ বিভাগের আরো খবর





সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি:
আবদুল্লাহ আল হারুন
প্রধান সম্পাদক:
আসিফ হাসান (নূর নবী)

সম্পাদক ও প্রকাশক:
মো. জিয়াউল হক
বিশেষ সংবাদদাতা:
র‌বিউল ইসলাম সো‌হেল

আমাদের মানচিত্র

ঠিকানা: দেওয়ান কমপ্লেক্স (৩য় তলা), ৬০/ই/১, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
কক্ষ নং ১৪/সি, নোয়াখালি টাওয়ার (১৪ তলা), ৫৫-বি, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০

ফোন: ০১৯১৪-৭৩৫৮৫৮, ০১৯১৪-৮৭৫৬৪০
ইমেইল: editor@amadermanchitra.com, amadermanchitrabd@gmail.com

Location Map
Copyright © 2012-2021
All rights reserved

design & developed by
corporate work