ঢাকা, বাংলাদেশ  |  সোমবার, ২৭ জুন ২০২২



  বিভাগ : সাহিত্য তারিখ : ২০-০৯-২০২০  


মৃত্যু: রকমারি জিজ্ঞাসার বুদ্বুদ


  শফিক হাসান



শফিক হাসান: ভালোলাগার বই তো অনেকই আছে, এর মধ্যে একটা বাছতে বলা মানে খড়ের গাদায় সুই খোঁজার দুরূহ কর্ম। তারপরও বুঝতে চেষ্টা করলাম সর্বশেষ কোন বইটি আমার চিন্তাজগতে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল। বেরিয়ে এলো উৎস প্রকাশন থেকে প্রকাশিত আবদুলাহ আল-হারুন এর নিরীক্ষাধর্মী বই ‘মৃত্যু: একটি দার্শনিক জিজ্ঞাসা’র নাম। ২০১১ সালে প্রকাশিত এ বই উৎসর্গ করা হয়েছে আমার প্রিয় দুইজন সাংবাদিক গোলাম মোর্তোজা ও স্বকৃত নোমানকে। লেখক জার্মানপ্রবাসী, পরে জেনেছি তিনি প্রয়াত নাট্য ও চলচ্চিত্রব্যক্তিত্ব আবদুলাহ আল মামুনের ছোট ভাই। এ ‘ছোট ভাই’য়ের বড় বড় চিন্তাঋদ্ধ লেখা পড়তাম ‘সাপ্তাহিক’ পত্রিকায়। পরে তো অপ্রত্যাশিতভাবে পেয়ে গেলাম মত্যু নিয়ে পুরো একটি বই-ই।
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কমনে আসে যায়’ আবহমানকাল ধরে এ জিজ্ঞাসা খুঁচিয়ে যাচ্ছে অনুসন্ধিৎসুদের। পৃথিবী সৃষ্টি, মানবসভ্যতা বিকাশের পর থেকে অদ্যাবধি এর গ্রহণযোগ্য কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। এ রহস্যময়তার ভিতর দিয়েই এগোচ্ছে সময়। সময়ের পরিμমায় ভাবুক মানুষের জিজ্ঞাসা, কৌতূহল আরও বাড়ছে। জীবজগতে একটি সত্য প্রতিষ্ঠিত-যার জন্ম আছে, তার মত্যু অবধারিত। তবুও থেমে থাকে না প্রশ্ন, রহস্যানুসন্ধানী মন ঠিকই খুঁজে যায়।
এ অমীমাংসিত রহস্য, ‘গোলমেলে ব্যাপার’ নিয়ে কেন মেতে উঠলেন লেখক আবদুলাহ আল-হারুন সাহেব? কেন জন্ম হলো ‘মৃত্যু: একটি দার্শনিক জিজ্ঞাসা’ বইয়ের! নাম থেকেই অনুমেয়, বইটির বিষয়স্তু কী।
বাংলাসাহিত্যে মৃত্যুবিষয়ক বই সম্ভবত এটিই প্রথম। ব্যতিμমী প্রকাশনা, সন্দেহ নেই। মানুষের চিরন্তন ভাবনাকে লেখক আরও উস্কে দিয়েছেন। মানুষ জন্মগ্রহণ করে, তার বয়স বাড়ে, এক সময় মারাও যায়। কেউ কেউ রোগে ভুগে, দুর্ঘটনায় কিংবা অন্য কোনো কারণে ‘সময়ের আগেই’ মৃত্যুবরণ করে। এই যে মৃত্যু, কেন মৃত্যু হয়? মৃত্যুর পর কী থাকে-বেহেস্ত-দোজখ, স্বর্গ-নরক নাকি অন্য কিছু? তারপর কী, পুনর্জন্ম? আত্মা কোথায় থাকে, কী করে তখন?
এরকম নানা জিজ্ঞাসা দানা বেঁধে আছে। লেখক অবশ্য মৃত্যুপরবর্তী অবস্থা নিয়ে তেমন মাথা ঘামাননি, থেমে আছেন মৃত্যু, জীবনাবসান পর্যন্ত। নানা দৃষ্টিকোণ থেকে চুলচেরা বিশেষণের মাধ্যমে মৃত্যু-ব্যবচ্ছেদে নেমেছেন। তার এই জিজ্ঞাসা তৈরি হওয়ার পিছনে ভূমিকা রেখেছে হজপিস হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা। জার্মানিতে হজপিস হিসেবে লেখক কয়েক শ’ মৃত্যুপথযাত্রীকে সঙ্গ দিয়েছেন; কাছ থেকে দেখেছেন। দেখতে দেখতে মৃত্যু হয়ে পড়েছে তার কাছে ‘ডালভাত’।
হজপিস হচ্ছে মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তিকে সঙ্গদান, উজ্জীবিতকরণ।
বইটি ৪ পর্বে বিভক্ত-জন্ম ও মৃত্যু, মুমূর্ষু ও মৃত্যুর সংজ্ঞা, মৃত্যুসঙ্গ, মৃত্যুর দোরগোড়ায়।
প্রথম পর্বে আলোচিত হয়েছে জন্ম-মৃত্যুর নানা দিক, জন্ম-মৃত্যুর ওপর ধর্মের নানা প্রভাব, সমাজ-সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয়ে। হিন্দু ধর্মের কথিত যে জন্মান্তর প্রথা তাও লেখকের কলম এড়ায়নি-
হিন্দু ধর্মে জন্মান্তরের কথা বলা হয়েছে। বর্ণ প্রথাকে টিকিয়ে রাখার জন্য এই পুনর্জন্ম থিয়োরিটি খুবই কার্যকর। এতে করে নিম্নবর্গে অচ্ছুৎ হিন্দুরা বিভিন্ন সামাজিক নির্যাতন, অসম আচরণ, অবর্ণনীয় দারিদ্র্য, সীমিত সুযোগ-সুবিধা ও সামাজিক অত্যাচারকে নিজেদের আগের জন্মের কর্মফল মনে করে বর্তমান জীবনের দুঃখ-দুর্দশাকে বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নেন। বর্ণহিন্দুদের সেবা শুশ্রষা, মলবাহক, জুতা সেলাই আর শ্মশানবন্ধু হয়ে এ জীবনে বিনা প্রতিবাদে, মুখ বুজে ভালো (!) কাজ করে পরবর্তী জীবনে উচ্চবর্ণের হিন্দু হয়ে জন্মাবার সৌভাগ্য অর্জন করার স্বপ্ন দেখে!
মৃত্যু নিয়ে দেশি-বিদেশি লেখক, গবেষক, কবি, মরমি সাধকদের ভাবনার অন্ত ছিল না। রবীন্দ্রনাথ, হাসন রাজা, লালন, কাহলিল জিবরান, রাইনার মারিয়া রিলকে প্রমুখ নানামুখী ভাবনায় ‘ছটফট’ করেছেন। কারও ভাবনা হয়ে পড়েছে দ্বিমুখী তথা পরস্পরবিরোধী। রবীন্দ্রনাথের উচ্চারণে নানা সময়ে, নানাভাবে ধরা দিয়েছে মৃত্যু-যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে, আজি হতে শতবর্ষ পরে, মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে; মরমি সাধক হাসন রাজা প্রদীপ্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন-লোকে বলে বলেরে ঘরবাড়ি বালা না আমার...। লালন শাহ’র খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়-উচ্চারণগুলো আজও সর্বজনীন, সমান প্রাসঙ্গিক। খাঁচার পাখিকে কিছুতেই ধরা যায় না। পোষ মানানো যায় না।
কাহলিল জিবরানের জবানীতে ধরা পড়েছে খ্রিস্টান সাধু সেন্ট অগাস্টিন’র মৃত্যুভাবনা
মৃত্যু শুরু হয় তখনি, যখন মানুষ জন্ম নেয়। বেঁচে থাকা মানেই মৃত্যুর সঙ্গে বসবাস। জীবনকে যে গ্রহণ করে তাকে অবশ্যই মৃত্যুকেও স্বীকার করতে হবে। জন্ম নেবার জন্য আবশ্যিক ও একমাত্র পূর্বশর্তটিই হলো মৃত্যুবরণ। আমরা জন্ম নেবার পর থেকেই মুহূর্ত মৃত্যু তার দখলি স্বত্বের কথাটি আমাদের জানায়। দুঃখের বিষয়-এ মহাসত্যটি এড়িয়ে গিয়ে আমরা প্রায় সারাজীবনই অজ্ঞানতার ভান করি।
প্রায় প্রতিটি মানুষই সারাজীবন কিছু কথা বয়ে বেড়ায়-কাউকে বলতে পারে না। মৃত্যুকালে কাছের কোনো মানুষ কিংবা অনেক সময় বাইরের কারও কাছে দীর্ঘদিন বয়ে বেড়ানো গোপন কথাটি বলে ‘ভারমুক্ত’ হয়। বাংলাদেশে মৃত্যুপথযাত্রীরা সুযোগটি পায় না বললেই চলে। ফলে মৃত্যুপথযাত্রী যেন সময়ের আগেই মারা যায়! অন্যদিকে বিদেশে হজপিস হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে লেখকের সৌভাগ্য হয়েছে এমনই কিছু গভীর গোপন কথা শোনার। বলার অপেক্ষা রাখে না, এসব ‘গূঢ়’ কথা চমকে দেয়ার জন্য যথেষ্ট।
‘ক্লিনিক্যাল ডেড’ তথা আপাত-মৃত্যুবরণকারী কিছু লোকের অভিজ্ঞতা ভাবনা উদ্রেককারী। মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে আসা মানুষের কেউ কেউ ‘সেখানকার’ অভিজ্ঞতার বর্ণনায় কেউ নিজেকে অন্ধকার সুড়ঙ্গ পেরোতে দেখেন, কেউবা আবিষ্কার করেন আলোকমূর্তি, আবার কেউ কেউ শরীরের বাইরে গিয়ে নিজের শায়িত শরীর দেখতে পান-কতজনের কত অভিজ্ঞতা। অব্যাখ্যেয় এসব বিষয় ডাক্তারদের কাছে যেমন রহস্যাবৃত তেমনি ভুক্তভোগীরাও দ্ব›েদ্ব থাকে; হাস্যাস্পদ হওয়ার ভয়ে এসব অভিজ্ঞতা কারও সঙ্গে শেয়ার করে না।
সহজভাবে মৃত্যুকে দেখতে পারে এমন মানুষ কমই।
লেখক আবদুলাহ আল-হারুনও মৃত্যুকে সহজভাবে দেখার লোক। নইলে এমন কঠিন বিষয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করে, সে গবেষণার লিখিত রূপ পাঠকের হাতে পৌঁছাতে সচেষ্ট থাকবেন কেন!
গতানুগতিক বইয়ের ভিড়ে বইটি নিঃসন্দেহে ব্যতিম। বইটি চিন্তার খোরাক জোগায়, মৃত্যুকেও চিনিয়ে দেয় নতুন পরিচয়ে!

অগ্রদূত প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বইর প্রচ্ছদ

বি.দ্র.- ‘মৃত্যু একটি দার্শনিক জিজ্ঞাসা’র নতুন বর্ধিত ও পরিমার্জিত সংস্করন, ২০১৯ সালের বইমেলায় প্রকাশ করেছে অগ্রদুত প্রকাশনি।

 


 নিউজটি পড়া হয়েছে ৭৪৮ বার  






 

সাহিত্য

কথা দিলাম

জাকিয়া রহমানের কবিতা: সমাজ ও সমকালের দর্পণ

জাকিয়া রহমানের একগুচ্ছ কবিতা

বিটবুর্গ রহস্য-৩

বিটবুর্গ রহস্য-২

বিটবুর্গ রহস্য-১

আস্ট্রিদের পিপ্পি ও সুইডিশ-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক

সময়

ময়না মামুর বাড়ি যাবো

একগুচ্ছ কবিতা

সাহিত্য বিভাগের আরো খবর





সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি:
আবদুল্লাহ আল হারুন
প্রধান সম্পাদক:
আসিফ হাসান (নূর নবী)

সম্পাদক ও প্রকাশক:
মো. জিয়াউল হক
বিশেষ সংবাদদাতা:
র‌বিউল ইসলাম সো‌হেল

আমাদের মানচিত্র

ঠিকানা: দেওয়ান কমপ্লেক্স (৩য় তলা), ৬০/ই/১, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
কক্ষ নং ১৪/সি, নোয়াখালি টাওয়ার (১৪ তলা), ৫৫-বি, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০

ফোন: ০১৯১৪-৭৩৫৮৫৮, ০১৯১৪-৮৭৫৬৪০
ইমেইল: editor@amadermanchitra.com, amadermanchitrabd@gmail.com

Location Map
Copyright © 2012-2022
All rights reserved

design & developed by
corporate work