ঢাকা, বাংলাদেশ  |  সোমবার, ২৭ জুন ২০২২



  বিভাগ : সাহিত্য তারিখ : ২৯-০৬-২০২১  


ময়না মামুর বাড়ি যাবো


  কামরুল ইসলাম, কাজল



কামরুল ইসলাম, কাজল: আমার এ কাহিনি ইন্টারনেট আর মোবাইলের অনেক আগের যুগের। তারবাহিত টেলিফোন সবেমাত্র তখন স্বাধীন বাংলাদেশে হাঁটি হাঁটি পা পা করে পায়ের পাতা ছেড়ে উপরের দিকে হাঁটুর কাছাকাছি উঠবার চেষ্টা করছে। শহরের মানুষের গোচরিভ‚ত হচ্ছে যে টেলিফোন বলে কিছু একটা আছে। স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশে অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানে টেলিফোন ছিল বৈকি; তবে তা ছিল কিছু সরকারি অফিস আর উচ্চবিত্ত পরিবারের দখলে। রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরে কিছু কিছু অফিস ছাড়াও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বড় কলকারখানা, বিমানবন্দর, সামরিক বাহিনী, এদের দখলেই ছিল তৎকালীন তারবাহিত টেলিফোন। তখনকার টেলিফোনগুলোও ছিল দেখার মত। গোল চাক্তির মত একটি নাম্বার প্লেটে ১ থেকে ০ পর্যন্ত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ডায়াল করতে হতো। এক শহর থেকে আরেক শহরে কল করতে হলে, টিএন্ডটির এক্সচেঞ্জের শরনাপন্ন হতে হতো। তাদের মাধ্যমে কল বুকিং দিয়ে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোন গতি ছিল না। দেশের বাইরে, অন্য দেশে কল দেয়া ছিল আরো ঝক্কি ঝামেলার ব্যাপার। আজ কল দিয়ে দেখা যাবে কল মিলছে কাল বা পরশু। শব্দের গুনগত মান যা-ই হোক না কেন বিলের মান ছিল উচ্চতর। মফস্বল শহরগুলোর অবস্থা ছিল আরো খারাপ। সেখানে টেলিফোনের দেখা মেলা ছিল উত্তর মেরুতে শীতকালে সূর্যি মামার দেখা পাবার মত। দেখা মিললেও শব্দ শোনা যাবে কিনা তার কোন নিশ্চয়তা ছিলো না।


এমনি এক সময়ে, ১৯৭৪ সালের কোন এক শীতের কুয়াশা ঢাকা সকালে, সুদুর দক্ষিণ অঞ্চল সাতক্ষীরা থেকে বিআরটিসির একটি লাল রং এর বাস এসে থামলো ঢাকা কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশানের পাশে অবস্থিত বিআরটিসি বাস টারমিনালে। তারবাহিত টেলিফোনের ন্যায় সেকালে যাত্রী পরিবহনের কিছুটা চিত্র একালের পাঠকদের সাথে শেয়ার না করলেই নয়। ঢাকা থেকে সাতক্ষীরার দূরুত্ব তখন ছিল ৩০০ কিলোমিটারের উপর। বর্তমানে বিভিন্ন বাইপাসের সৌজন্যে সেটা নেমে এসেছে ২৭৫ কিলোমিটারে। সেকালে ৭টি ফেরি পার হয়ে যাতায়াত করতে হতো ঢাকা-সাতক্ষীরা। সাতক্ষীরা থেকে নাভারন, ঝিকরগাছা, ঝশোহর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, ফরিদপুর, কামারখালীতে ফেরি পার। ওপারে আরিচা তারপর মানিকগঞ্জ ও সাভার হয়ে ঢাকা। নানা ধরনের ও আকারের শহর, গ্রাম আর অঞ্চল পার হয়ে তারপর রাজধানী ঢাকা। ভোর রাত ৩টায় বাস ছেড়ে ঢাকা পৌঁছাতো পরদিন সন্ধ্যায়। তাও যদি ফেরি চলাচল করতো নির্বিঘেœ। না হলে ৩টার গাড়ি তিন দিন পরেও পৌঁছাতো না। বিকেলে ছেড়ে আসা বাস পরদির ভোরে ঢাকা পৌঁছাতো, যদি যাত্রীদের কপাল ভালো থাকতো। তবে এখনো বিভিন্ন কারণে সকালে ছেড়ে আসা বাস কখনো কখনো রাত পেরিয়ে পরদিন সকালে ঢাকা পৌঁছায়।


সকালে আসা লাল সে বাসটি থেকে নামলো সাতক্ষীরা থেকে আসা এক যাত্রী। তিনি আসলে সাতক্ষীরা শহর থেকে নয়, এসেছেন শহর থেকে আরো ৭ মাইল দূরবর্তী এক গ্রাম থেকে। সে গ্রামের নাম শিমূলবাড়িয়া। শিমূলবাড়িয়া থেকে মাত্র ৭ মাইল পাড়ি দিয়ে শহরে বাস ধরতে আসাটাও চাট্টিখানি কথা নয়। সেকালে অনেক মানুষই পাওয়া যেত যারা কখনো গ্রাম থেকে সাতক্ষীরা শহরে আসে নি বা তাদের আসার সুযোগ হয়নি অথবা দরকার পড়েনি। শিমূলবাড়িয়া থেকে আমাদের বাস যাত্রী, আবুল ভাই যাত্রা করেছিলেন পাঁয়ে হেটে সাত সকালে, নাস্তা সেরেই। অনেক দুরের পথ। অর্ধেক পাঁয়ে হেটে, কিছুটা নৌকায় আর বাকিটা সাইকেল ভ্যানে, যা কিনা স্থানীয়ভাবে হেলিকপ্টার নামে বহুল পরিচিত। এই হেলিকপ্টারে চড়ে তিনি দুপুর নাগাদ সাতক্ষীরা পৌঁছান। দুপুরে চাচাতো ভাইয়ের জুতোর দোকানে খাওয়া দাওয়া আর বিশ্রাম সেরে আবুল ভাই বিকেলের বাসে ঢাকা রওয়ানা হন। এখানে চাচাতো ভাইয়ের সাথে দুপুরে ওনার কথপোকথনের কিছু নমুনা দেওয়া হলো।

চাচাতো ভাইঃ তা ঢাকাতে কনে যাচ্ছাও ম্যায়্যা ভাই? কার কাছে যাচ্ছাও?


আবুল ভাইঃ আমি যাতিছি মামুর সাথ দিকা করতি।


চাচাতো ভাইঃ কোন মামু কও দিকি?


আবুল ভাইঃ যাবো আমার ময়না মামুর বাড়িত, দিকা করতি (উল্লেখ্য যে ময়না মামা আবুল ভাইয়ের আপন মামা নন। মামার ছোট বোনের সাথে বিয়ে হয়েছে আবুলের মামার সাথে। সে সুত্রে ডাকেন মামা বলে)।


চাচাতো ভাইঃ তা না হয় মামুর বাড়িত যাবা। কিন্তু মামুর নাম ঠেকানা জানা লাগবি না? জান?


আবুল ভাইঃ ঠেকানা লাগবি ক্যান? ঢাকায় ন্যামে ভ্যানওয়ালা ছ্যামড়ারে মামুর নাম বল্লিই, সে আমারে মামুর বাড়িত পৌঁছে দিবানি।


চাচাতো ভাইঃ ম্যায়্যা ভাই, শুনিচি ঢাকাতে গাদো গাদো মানুষ। কেউ কারুর সাথে চিন পরিচয় নি। ওখানে গেলি পর তুমিতো হারায়ে যাবানে।


আবুল ভাইঃ তুই চিন্তে করিসনে যাদু। আমি আল্লার পর ভরসা করে ঠিকমত যাতি পারবানি।


অতঃপর আমাদের সেই আবুল ভাই পরদিন, অর্থাৎ আজ সকালে ঢাকা এসে আধো ঘুম আর আধো জাগরনীতে বাস থেকে নিজের ছোট্ট ব্যাগটি আর মামার জন্য আনা নারকেলের বস্তাটি নিয়ে সগৌরবে নেমে পড়লেন। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে তখন সকালের কিছু ট্রেনও এসে ভিড়েছে। রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন বিআরটিসি বাস ডিপোতেও এসেছে বিভিন্ন জেলা থেকে বিআরটিসি বাস। হৈ হুল্লোড়, হট্টগোল, কুলীদের হাঁক ডাঁক, ফেরিওয়ালাদের চিৎকার ইত্যাদি দেখে আর শুনে আবুল ভাই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে একপাশে বসে পড়লেন। আধা ঘণ্টা বসে থাকার পর আবুল ভাইয়ের হুঁশ হলো এবার।


ময়না মামুর বাড়ি যাতি হবি।


তিনি তাড়াতাড়ি উঠে এদিক ওদিক তাকালেন। ভিড় বাট্টা কিছুটা কমেছে। আবুল ভাই একটু স্বস্তি পেলেন যেন।


এমত অবস্থায় এক রিকশাওয়ালা আবুল ভাইকে দেখে কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলো,
-কোথায় যাবেন?


আবুল ভাই প্রথমে ভেবে পাচ্ছিল না কি বলবে। মনে পড়লো চাচাতো ভাইয়ের কথা। সত্যি যদি রিকশাওয়ালা তার ময়না মামুকে না চেনে, তাহলে কি হবে? শিমূলবাড়িয়া নেমে যে কাউকে আবুলের কথা বলতেই তার বাড়িত পৌঁছে দেয়। তাহলে এখানে পারবি না ক্যান? মনে মনে ভাবে আবুল ভাই।


তাকে চুপচাপ থাকতে দেখে রিকশাওয়ালা আবার প্রশ্ন করে,
-কোথায় যাবেন? উঠে আসেন। যেতে যেতে বলবেন ক্ষণ কোন দিকে যাবো।
আসলে রিকশাওয়ালা সকাল সকাল এ যাত্রী হারাতে রাজী নয়। ভাবলেন, যাত্রী হয়তো এখনো ঘুমের ঘোরে আছে। পরে মনে পড়বে কোথায় যাবে। আবুল ভাই কিছু না ভেবে বাক্স পেটরা নিয়ে এবার রিকশায় উঠে বসলেন। রিকশা চলতে শুরু করলো কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশানকে ডানে রেখে উত্তর দিকে। উত্তর দিক দিয়ে যাওয়া যাবে ফকিরাপুল, শান্তিনগর, মগবাজার, খিলগাঁও, গোড়ান বা আরো দুরে গেলে রামপুরা বা বাড্ডা।


কিছুদূর এসে এবার রিকশাওয়ালা গতি কিছুটা কমিয়ে জিজ্ঞাসা করলো,

-ভাই এবার বলেন কোনদিকে যাবেন? সামনে ফকিরাপুলের মোড়।

-ময়না মামুর বাড়িত যাবো। আমারে ওকানে নে যাও। দ্বিধা দ›দ্ব নিয়ে আবুল ভাই বলে ফেললেন।
উত্তর শুনে রিকশাওয়ালা ভ্যাবাচকা খেয়ে কষে ব্রেক চেপে রিকশা থামালো। আবুল ভাই অর্ধেক পড়তে গিয়েও সামলে নিলেন। এবার রিকশাওয়ালা রেগে মেগে আবুল ভাইকে বললেন।
- ভোদাই বলে কিনা ময়না মামুর বাড়ি যাবো। মামা যেন দেশের মন্ত্রী মিনিস্টার, সবাই তারে চিনবে! সকাল সকাল পথ্রম ক্ষেপটাই আমার কুফা। সারাদিন না জানি আমার কেমন যাবে, তা আল্লাহ-ই জানেন। গজর গজর করতে লাগলো রিকশাওয়ালা।
আবুল ভাই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে আছে দেখে রিকশাওয়ালা আবার এক চোট নিল।
- এই মিঞা, বসে আছেন ক্যান? আমার ভাড়ার টাকাটা দিয়ে বিদেয় হন। এই ঢাকা শহরে কেউ কাউরে চিনে না। এটা গ্রাম না। আপনি কোথা থেকে আসছেন?
এবার আবুল ভাইও রেগে ঝগড়া বাঁধিয়ে দিলেন রিকশাওয়ালার সাথে।
- আমি কনেত্বে এয়েছি সিডা তুমার জানার দরকার নি। একন ময়না মামুর বাড়িত নে চল, তারপর ভাড়া দেব। দুজনের ঝগড়া দেখে আশে পাশের লোকজন জড়ো হয়ে গেল।


রিকশা দিয়ে ঠিক সে সময় আবুল ভাইয়ের বহুল আকাক্সিক্ষত ময়না মামু সকাল সকাল একটি কাজ সেরে খিলগাঁও নিজ বাড়ি ফিরে যাচ্ছিলেন। দুর থেকে জটলা দেখে আর সাতক্ষীরার আঞ্চলিক ভাষা শুনে তাড়াতাড়ি রিকশা থামালেন। রিকশায় বসা যাত্রীকে দেখে ওনার মাথা ঘুরে উঠলো।


  • আরে আবুল, তুমি কোত্থেকে? কখন এসেছো? আমি তো কিছুই জানি না।
    আবুল ভাই এবার রিকশা থেকে নেমে মামার পায়ে পড়ে সালাম দিয়ে হাউ মাউ করে কেঁদে ফেললো। বললো,
    - মামু আমি আজ বেয়ান বিলাতে বিআরটিসিতে করি ঢাকায় এয়েছি আপনার সাথ দিকা করতি। কতদিন দিকা নাই। মনডা আনচান করতেছেল।
    রিকশাওয়ালা এবার সুযোগ বুঝে মামার কাছে ভাড়াটা চাইলো আর সাথে কিছুটা ঝাড়ি মামার উপরও ঝাড়লো।
    -কোথাকার ভাগ্নে আপনার? ঠিকানা জানে না, বলে কিনা ময়না মামুর বাড়ি নিয়ে চল!
    মামা কথা না বাড়িয়ে দুটাকা ভাড়া দিয়ে আবুল ভাইকে মালসমেত নিজ রিকশায় উঠিয়ে খিলগাঁও রওয়ানা হলেন।
    আবুল ভাই এরপর আর ময়না মামুর সন্ধানে ঢাকা এসেছিলেন কিনা সেটা গুগলে সার্চ করলে হয়তোবা পাওয়া যেতে পারে। আমি অবশ্য করিনি।
    আপনারা করলেও করতে পারেন।

       (একটি সত্য কাহিনি অবলম্বনে রচিত)

       জুন ২০২১

        স্টকহলম, সুইডেন


 নিউজটি পড়া হয়েছে ৫৬৮ বার  






 

সাহিত্য

কথা দিলাম

জাকিয়া রহমানের কবিতা: সমাজ ও সমকালের দর্পণ

জাকিয়া রহমানের একগুচ্ছ কবিতা

বিটবুর্গ রহস্য-৩

বিটবুর্গ রহস্য-২

বিটবুর্গ রহস্য-১

আস্ট্রিদের পিপ্পি ও সুইডিশ-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক

সময়

একগুচ্ছ কবিতা

মৃত্যু: রকমারি জিজ্ঞাসার বুদ্বুদ

সাহিত্য বিভাগের আরো খবর





সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি:
আবদুল্লাহ আল হারুন
প্রধান সম্পাদক:
আসিফ হাসান (নূর নবী)

সম্পাদক ও প্রকাশক:
মো. জিয়াউল হক
বিশেষ সংবাদদাতা:
র‌বিউল ইসলাম সো‌হেল

আমাদের মানচিত্র

ঠিকানা: দেওয়ান কমপ্লেক্স (৩য় তলা), ৬০/ই/১, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:
কক্ষ নং ১৪/সি, নোয়াখালি টাওয়ার (১৪ তলা), ৫৫-বি, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০

ফোন: ০১৯১৪-৭৩৫৮৫৮, ০১৯১৪-৮৭৫৬৪০
ইমেইল: editor@amadermanchitra.com, amadermanchitrabd@gmail.com

Location Map
Copyright © 2012-2022
All rights reserved

design & developed by
corporate work